জেনারেটিভ এআইয়ের বাইরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ: হাইপ চক্রটা আসলে কেমন?
জেনারেটিভ এআই (যেমন চ্যাটজিপিটি বা ডাল-ই) আজকাল সবখানে আলোচনার কেন্দ্রে। টেক দুনিয়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই এর ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগৎটা শুধু জেনারেটিভ এআই-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বাইরেও অনেক দারুণ ক্ষেত্র আছে, যা নীরবে আমাদের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। তাহলে চলুন, জেনারেটিভ এআইয়ের বাইরে থাকা এই এআই প্রযুক্তিগুলোর 'হাইপ চক্র' বা 'Hype Cycle' কেমন, তা নিয়ে একটু গভীরে আলোচনা করি।
আপনি হয়তো গার্টনার হাইপ সাইকেল (Gartner Hype Cycle) সম্পর্কে শুনেছেন। এটি একটা গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশন যা দেখায় কিভাবে একটা নতুন প্রযুক্তি সময়ের সাথে সাথে মানুষের প্রত্যাশা, জনপ্রিয়তা এবং পরিপক্বতার বিভিন্ন পর্যায় পার করে। এর মূল পর্যায়গুলো হলো: 'ইনোভেশন ট্রিগার' (Innovation Trigger), 'পিক অফ ইনফ্লেটেড এক্সপেকটেশনস' (Peak of Inflated Expectations), 'ট্রাফ অফ ডিসিলিউশনমেন্ট' (Trough of Disillusionment), 'স্লোপ অফ এনলাইটেন্টমেন্ট' (Slope of Enlightenment) এবং 'প্লাটো অফ প্রোডাকটিভিটি' (Plateau of Productivity)। এখন দেখা যাক, জেনারেটিভ এআইয়ের বাইরে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ এআই ক্ষেত্র এই চক্রের কোন পর্যায়ে আছে।
কম্পিউটার ভিশন (Computer Vision): প্রত্যাশার শিখরে না থাকলেও কাজের ক্ষেত্র বাড়ছে
কম্পিউটার ভিশন মানে হলো কম্পিউটারকে মানুষের মতো করে দেখতে এবং বুঝতে শেখানো। ফেস রিকগনিশন, অবজেক্ট ডিটেকশন, স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং— এসবই কম্পিউটার ভিশনের অংশ। কিছু ক্ষেত্রে, যেমন নিরাপত্তা বা কোয়ালিটি কন্ট্রোল, কম্পিউটার ভিশন 'প্লাটো অফ প্রোডাকটিভিটি'-এর কাছাকাছি চলে গেছে। কিন্তু সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত গাড়ি বা রোবটের জন্য এটি এখনো 'ট্রাফ অফ ডিসিলিউশনমেন্ট' বা 'স্লোপ অফ এনলাইটেন্টমেন্ট'-এর মধ্যে আছে, যেখানে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফরমেন্স না পাওয়ার কারণে মানুষ হতাশ হচ্ছে, কিন্তু ধীরে ধীরে আসল ব্যবহার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
রোবোটিক্স (Robotics) এবং এআই: ধীরগতিতে এগিয়ে চলা
রোবোটিক্স মানে শুধু কারখানার রোবট নয়, বরং মানুষের মতো দেখতে বা মানুষের কাজ করতে পারা রোবট। এখানে এআইয়ের ভূমিকা অনেক বড়। উন্নত রোবোটিক্স এখনো 'ইনোভেশন ট্রিগার' বা 'পিক অফ ইনফ্লেটেড এক্সপেকটেশনস'-এর প্রথম দিকেই আছে। সাধারণ মানুষ এখনো মানুষের মতো রোবটের অনেক বেশি ক্ষমতা আশা করে, যা বাস্তবে এখনো অনেক দূরের পথ। ডেলিভারি ড্রোন বা কিছু সার্ভিস রোবট হয়তো 'স্লোপ অফ এনলাইটেন্টমেন্ট'-এর দিকে এগোচ্ছে, কিন্তু সত্যিকারের রোবট সহচর পেতে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
এক্সপ্লেইনেবল এআই (Explainable AI - XAI): এখনকার দিনের জরুরি প্রয়োজন
জেনারেটিভ এআই সহ আজকের দিনের বেশিরভাগ এআই সিস্টেমগুলো একটা 'ব্ল্যাক বক্স'-এর মতো কাজ করে— কী করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা বোঝা মুশকিল। এক্সপ্লেইনেবল এআইয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো এআই সিস্টেমগুলো কিভাবে কাজ করে, তা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা। স্বাস্থ্যসেবা, ফিনান্স বা সামরিক খাতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। XAI এখন 'ইনোভেশন ট্রিগার' থেকে 'পিক অফ ইনফ্লেটেড এক্সপেকটেশনস'-এর দিকে এগোচ্ছে। মানুষ এর গুরুত্ব বুঝতে পারছে, এবং ভবিষ্যতের সব এআইয়ের জন্য এটি অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং (Reinforcement Learning): সীমাবদ্ধ কিন্তু শক্তিশালী
রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং হলো এআইকে এমনভাবে শেখানো যেন সে নিজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। গেম খেলা (যেমন আলফাগো), রোবোটিক্স নিয়ন্ত্রণ বা সাপ্লাই চেইন অপটিমাইজেশন— এসব ক্ষেত্রে এর দারুণ প্রয়োগ দেখা যায়। তবে এর বাস্তব প্রয়োগ এখনো বেশ সীমাবদ্ধ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি 'ট্রাফ অফ ডিসিলিউশনমেন্ট'-এর কাছাকাছি। কারণ, রিয়েল-ওয়ার্ল্ড পরিস্থিতিতে এর প্রয়োগ এখনো বেশ কঠিন এবং ডেটা-এর চাহিদা অনেক বেশি। তবে ভবিষ্যতে এর সম্ভাবনা অনেক।
উপসংহার
জেনারেটিভ এআই নিঃসন্দেহে একটি বৈপ্লবিক প্রযুক্তি, তবে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশাল ক্ষেত্রের কেবল একটি অংশ। কম্পিউটার ভিশন, রোবোটিক্স, এক্সপ্লেইনেবল এআই, রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং— এই সব ক্ষেত্রই নিজস্ব গতিতে বিকশিত হচ্ছে এবং মানবজাতির জন্য নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। প্রতিটি প্রযুক্তিরই নিজস্ব হাইপ চক্র আছে, এবং সময়ের সাথে সাথে আমাদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি হয়। ভবিষ্যতে আমরা এআইয়ের আরও অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রয়োগ দেখতে পাব, যা আমাদের জীবনকে আরও সহজ ও উন্নত করবে।
Post a Comment