এআই: বিভিন্ন দেশের কৌশল ও ভাবনা
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই (AI) এখন পৃথিবীর আলোচনার কেন্দ্রে। আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্প, অর্থনীতি, এমনকি সরকারের নীতিমালা পর্যন্ত সব জায়গায় এর প্রভাব চোখে পড়ছে। এআই যে শুধু প্রযুক্তিগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তা নয়; এটি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও এক বিরাট ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সব দেশ কি একই ভাবে এআইকে দেখছে? না, একেক দেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং লক্ষ্য অনুযায়ী তাদের এআই নীতিমালায় ভিন্নতা দেখা যায়। আসুন, বিশ্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দেশ কীভাবে এআইকে গ্রহণ করছে, তা নিয়ে একটু আলোচনা করি।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী মডেল
যুক্তরাষ্ট্র এআই গবেষণায় এবং এর প্রয়োগে দীর্ঘদিন ধরেই নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। তাদের মূল ফোকাস হলো উদ্ভাবন এবং বেসরকারি খাতের মাধ্যমে প্রযুক্তির বিকাশ। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন-এর মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলো এখানেই গড়ে উঠেছে। মার্কিন সরকার মূলত গবেষণার জন্য ফান্ডিং দেয় এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে এআই প্রযুক্তি আরও উন্নত করার জন্য উৎসাহ যোগায়। তবে তাদের এআই নীতিমালার বড় অংশই আসে শিল্প এবং প্রতিরক্ষা খাতের চাহিদা থেকে। এখানে নৈতিকতা বা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে উদ্ভাবনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যদিও সম্প্রতি এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় চালিত অগ্রগতি
চীন এআই প্রযুক্তিতে দ্রুত উন্নতি করছে এবং বৈশ্বিক নেতৃত্ব অর্জনের জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের এআই মডেল যুক্তরাষ্ট্রের থেকে বেশ আলাদা। এখানে সরকার সরাসরি এআই গবেষণায় এবং এর প্রয়োগে বিশাল বিনিয়োগ করে। বিগ ডেটা, ফেস রিকগনিশন, স্মার্ট সিটি - এসব ক্ষেত্রে চীনের অগ্রগতি লক্ষণীয়। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে এআইতে বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়া। চীনে ডেটা সংগ্রহ এবং ব্যবহারে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার চেয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। তাদের এই মডেল দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নতি নিয়ে এলেও, কিছু পশ্চিমা দেশে এ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৈতিক ও মানবিক পন্থা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এআইয়ের নৈতিক দিকগুলো এবং মানবিক ব্যবহার নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তাভাবনা করছে। তারা চায় এআই যেন মানুষের অধিকার ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়। ইইউ এর জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (জিডিপিআর) যেমন ডেটা গোপনীয়তার জন্য একটা বৈশ্বিক মানদণ্ড তৈরি করেছে, তেমনই তারা এআইয়ের জন্যও একটি কঠোর আইনি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে। তাদের এআই আইন (AI Act) এর মূল লক্ষ্য হলো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এআই সিস্টেমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে এর অপব্যবহার না হয় এবং মানুষের উপর এর খারাপ প্রভাব না পড়ে। এই পন্থার কারণে উদ্ভাবনের গতি কিছুটা ধীর হতে পারে, কিন্তু এটি এআইকে আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করতে সাহায্য করবে।
অন্যান্য দেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ কৌশল
- যুক্তরাজ্য: দেশটি এআই গবেষণায় বেশ এগিয়ে। তারা মূলত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নীতিমালার মাধ্যমে এআইয়ের নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইছে।
- কানাডা: এআই গবেষণায় বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে কানাডার বিশেষ নজর আছে। তারা এআইয়ের নৈতিক দিকগুলো নিয়েও কাজ করছে।
- ভারত: ভারত 'এআই ফর গুড' (AI for Good) বা জনকল্যাণে এআই ব্যবহারের উপর জোর দিচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি এবং শিক্ষা খাতে এআইয়ের প্রয়োগে তাদের আগ্রহ বেশি।
- জাপান: জাপানে বার্ধক্যজনিত সমস্যার সমাধানে এআইয়ের ব্যবহার, বিশেষ করে রোবোটিক্স এবং স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের প্রয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শেষ কথা
দেখা যাচ্ছে, এআই নিয়ে প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব কৌশল এবং অগ্রাধিকার রয়েছে। কেউ উদ্ভাবনকে সবার আগে রাখছে, কেউ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে, আবার কেউ নৈতিকতা এবং মানুষের অধিকারকে। এই বৈচিত্র্য এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎকে নানা দিক থেকে প্রভাবিত করবে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, এআই এখন শুধু প্রযুক্তিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়, এটি প্রতিটি দেশের সরকার, সমাজ এবং অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতের জন্য জরুরি হলো, এই প্রযুক্তিকে কীভাবে মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহার করা যায়, সেই বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটা বোঝাপড়া তৈরি করা।
إرسال تعليق